Wednesday, 18 August 2010

মানুষের মত মানুষ

মানুষ বড়ই আজব প্রাণী,
বিচিত্র আর ভেক-ধারী,
হরেক সময় হরেক মুখোশ,
রং-বেরঙ্গের, ঝকমারি!

আজকে যদি ডাইনে বেঁকে
ত্রিশুল হাতে লাফ মারে,
কালকে তবে বাঁদিক ঘেঁসে
কাস্তে শানায় বার বারে!

সমস্ত দিন ধান্দাবাজী,
মুর্গি ধরার ফন্দি রে!
সন্ধ্যে হলেই খোলস ছেড়ে
পড়ছে ঢুকে মন্দিরে!

সুযোগ পেলেই নন্দীগ্রামে
ভৃঙ্গি সেজে নাচতে চায়,
অমনি আবার নারদ রূপে
সিঙ্গুরেতে মান ভাঙ্গায়!

হঠাৎ কেমন হায়না সেজে
লোলুপ চোখে ঠোঁট চাটে,
তারপরেতেই আয়না দেখে
মুখ ভেঙ্গিয়ে জিভ কাটে!

তাইতো আমি ঠিক করেছি
আর একটিবার জন্মাবো
হবই হব পাগলা কুকুর,
মানুষ পেলেই কামড়াবো!

থোড়-বড়ি-খাড়া

লিখি আমি পদ্য, লিখি রাতি ভোর,
থোড়-বড়ি-খাড়া আর খাড়া-বড়ি-থোড়।

রোজ রোজ ভাবি কত নতুন টপিক,
কোনওটা ব্যাথায় ভরা, কোনওটা কমিক –
তুমি কেন আচমকা চলে যাও দূরে?
লাট্টুরা আজীবন মরে কেন ঘুরে?

গাড়ি কেন সোজা যায়? চাকা কেন গোল?
গান গাওয়া ছেড়ে কেন রাধা খায় দোল?
চাষী কেন চাষ করে? পাখি কেন ওড়ে?
সুন্দরী ঘোরে কেন গড়িহাট মোড়ে?

মধু কেন চ্যাটচ্যাটে? গুড়ে কেন বালি?
ক্যাসিয়াস ক্লে কেন হয়ে গেল আলি?
মাতালরা টাল খেয়ে ধরে কেন থাম?
গুবরে পোকার কেন ওরকম নাম?

গাধা কেন রোজ রোজ মুখ বুজে খাটে?
নেতা কেন গুল মারে? মশা কেন কাটে?
চুলে কেন হুল মারে উগ্র উকুন?
সাগরের জলে কেন গোলা থাকে নুন?

এত ভাবি, তবু দেখি ঘুরে ফিরে মোর
(সেই) থোড়-বড়ি-খাড়া আর খাড়া-বড়ি-থোড়।

আহা রে!

হঠাৎ সেদিন যাচ্ছি কাজে,
তখন বোধহয় দশটা বাজে,
দেখি তুমি দারুণ সাজে
বাস থেকে যাও নেমে –
দেখেই কেমন সুড়ুৎ করে
গেলুম পড়ে প্রেমে!

সেই যে সেবার বোশেখ মাসে
দেখি তুমি উঠলে বাসে,
বসলে এসে আমার পাশে
একটুও না ঘেমে –
তাতেই কেমন হাপুস ভাবে
গেলুম পড়ে প্রেমে!

আবার সেদিন, বর্ষা কালে,
রঙ লাগিয়ে ফরসা গালে
এগিয়ে গেলে দুলকি চালে
একবারও না থেমে –
পেছন পেছন আমিও তখন
ব্যাকুল হলুম প্রেমে!

আজকে শুনি, J.U. গিয়ে
স্কুল কলেজের পাট চুকিয়ে
তুমি নাকি অনার্স নিয়ে
পড়ছ সিধে M.A. –
তোমার এসব কাণ্ড দেখে
হারিয়ে গেলুম প্রেমে!

পাগলা দাদু

“ইরিব্বাবা, ইরিব্বাবা,” বলেই দাদু লাফ মারেন;
তারপরেতেই চুলকে কনুই ফোঁশফোঁশিয়ে হাঁফ ছাড়েন!
ওমনি আবার ডাইনে ঘুরে চমকে ওঠেন কাক দেখে,
তাইতে কেমন তৃপ্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন নাক ডেকে!

ঘন্টা পাঁচেক ঘুমিয়ে নিয়ে ওঠেন হঠাৎ খাট ছেড়ে,
আনিয়ে খাবার গিলতে থাকেন গপ-গপিয়ে, পাত পেড়ে;
খাবার খেয়েই ঢেঁকুড় তুলে, বাহান্ন বার কান মলে
ধর্মতলার রাস্তা ধরে হন-হনিয়ে যান চলে।

ওই যেখানে সবাই বসে ধর্ণা দিয়ে গান শোনে,
সেই সেখানে গিয়েই দাদু নাক খুঁটে যান আনমনে;
ওমনি হঠাৎ সামনে ঝুঁকে উলটো হাতে কান ঘষে
এদিক সেদিক তাকিয়ে নিয়ে দিদির পাশে যান বসে।

এ সব দেখে ভাইরা শুধোয়, “কি দাদু, কি ধান্দাটা?”
ক্লান্ত হেসে বলেন দাদু, “জানিস, আমি মান্ধাতা?
হাজার হাজার বছর ধরে শুনছি তোদের গুলতানি,
সবাই তোরা রুগ্ন গোরু, সাজিস যতই মুলতানী!

দাদার কথায়, দিদির কথায়, লাফিয়ে বেড়াস দিগ্‌বিদিক,
মারবে তোদের ভোজপুরী ল্যাং, ঠেকেই তোরা শিখবি ঠিক!
ক্যান্‌ রে তোরা দুচোখ বুজে ওদের কথায় চলতে চাস?
ভাবনা নিজের চুলোয় দিয়ে ওদের কথাই বলতে যাস?

এই দুনিয়ায় প্রশ্ন কত, আর কবে ভাই খুঁজবি রে?
কিছুই তোরা জানিস নে ভাই, আর কবে ফের বুঝবি রে?
জানিস কেন সর্ষে ইলিশ ভাপিয়ে খেলে ভাল্লাগে?
জানিস তোরা টক কেন কুল? লঙ্কা কেন ঝাল লাগে?

কক্ষণও কি দেখিস ভেবে, পায়রা কেন উড়তে চায়?
পতঙ্গরা আগুন দেখে বৃথাই কেন পুড়তে যায়?
হঠাৎ কেন ব্যর্থ প্রেমিক পদ্য লেখে স্বাশ ফেলে?
মুখটা কেন পেঁচিয়ে ওঠে চুন মাখিয়ে ঘাস খেলে?”

এই না বলে হঠাৎ দাদু থমকে গিয়ে, নোখ খুঁটে,
ফ্যাল-ফ্যালিয়ে তাকিয়ে দেখেন চতুর্দিকে, চোখ ফুটে;
ওমনি আবার ‘ডুম-ডুমা-ডুম’ বাজিয়ে নিয়ে ড্রামখানা
মালকোঁচাটা বাগিয়ে ধরে যান পালিয়ে নামখানা!

বাল ঠাকুরের দেশে

বাল ঠাকুরের আপন দেশে
আইন-কানুন সব্বনেশে।
সেথায় শুধুই বাহুর বলে
বাল-সেনারা এগিয়ে চলে,

শহর জুড়ে সেনার রাজ,
উদ্ধত তার কুচ-কাওয়াজ।


কেউ যদি তায় খেয়াল বশে
হিন্দি ভাষায় হিসেব কষে,
কিম্বা ধর, আপন মনে
ভোজপুরীতে ভজন শোনে,

ওমনি সেনা হাজির হয় –
কোতল করার দেখায় ভয়!


যারাই পাকের ক্রিকেট দেখে
তাদের ছবি চুলোয় রেখে
খান পঁচিশেক হুমকি জুড়ে
আগুন জ্বালায় ভরদুপুরে;

তারপরেতেই দেয় প্রহার –
রাত পেরলেই গঙ্গা পার!


সেথায় প্রেমে পড়ার আগে
বাল-ঠাকুরের টিকিট লাগে।
পড়লে প্রেমে টিকিট ছাড়া
সেনায় এসে লাগায় তাড়া,

ধরলে পরে বেজায় ক্লেশ –
উলটো গাধা – লুপ্ত কেশ!


সেথায় যদি গ্রীষ্ম-শীতে
কয় কথা কেউ মাদ্রাজীতে,
ওমনি সেনা লাফিয়ে উঠে
দল বেঁধে যায় সেথায় জুটে,

ইডলি-দোসায় রঙ গুলে
গিঁট বেঁধে দেয় পরচুলে!


কেউ যদি তায় বিরোধ করে
সেনায় এসে ওমনি ধরে;
বাল-সভাতে দাঁড় করিয়ে
ববং চবং মন্ত্র দিয়ে

সামনা থেকে হয় বিচার –
পটল তোলার দন্ড তার।

আর পাগলামো নয়

হঠাৎ সেদিন ইচ্ছে হল, পথের ওপর টুল পেতে
হলদে রঙের বালতি মাথায় গামছা পরে স্কুল যেতে।
ওমনি আমি ভড়কি দিয়ে আড়াই বোতল জল খেয়ে
হড়বড়িয়ে পালিয়ে গেলুম গোসল ঘরের কল বেয়ে।

যেই সেখানে বসব বলে মোড়ার পানে পা বাড়াই,
ওমনি আবার ইচ্ছে হল, স্টিম-রোলারে গা মাড়াই।
যেমনি ভাবা, তেমনি গেলুম বেলঘোরিয়া, বাস ধরে,
গিয়েই খেলুম পেপসি কোলা, শিশির ভেতর ঘাস ভরে।

তারপরেতেই এক পা তুলে দিলুম বিকট গান গেয়ে
“রাবন মামা ঢেকুঁড় তোলেন দশ মুখে দশ পান খেয়ে”।
গান শেষ হতেই কনুই তুলে নাচের ঢঙ্গে লাফ মেরে
“হাপুশ হুপুশ” দশ-বারো বার নিলুম আমি হাঁপ ছেড়ে।

তাতেই লোকে দেখে আমার এসব কান্ড-কারখানা
দৌড়ে এসে বঁড়শি দিয়ে ধরল আমার ঘাড় খানা,
সবাই মিলে “পাগল” বলে এইসা আমায় মার দিল,
গাত্রে হ’ল বেজায় ব্যাথা, কমল ওজন চার কিলো।

তাইতো আমি ঠিক করেছি, আর কখনও ভুল করে
আবোল তাবোল বকবো নাকো, টানবো না আর চুল ধরে,
ভাঁজবো না আর আজগুবী সুর, রাখব চেপে স্তব্ধ রোশ,
ঘরের কোনে নিজের মনে লিখবো বসে শব্দকোষ।

হয়তো এখন দম দমে

হয়তো এখন দম দমে,

লোড-শেডিঙে জ্বলছে পিদিম,
পড়ছে বোমা গিদিম গিদিম,
মন মাতানো চাঁদের আলোয়
পালাচ্ছে সব ভালোয় ভালোয়,
বাঁচতে হবে, বেজায় তাড়া,
হঠাৎ যে তাই শূন্য পাড়া,

সব কিরকম থমথমে –
হয়তো এখন দম দমে।


হয়তো এখন দম দমে,

ডেঙ্গি রোগের মসলা নিয়ে
উড়ছে মশা প্যান্‌প্যানিয়ে,
বসছে দাদুর ব্যাপ্ত টাকে,
কাটছে একে, কাটছে তাকে,
কাঁদছে ছেলে, কাঁপছে বুড়ো,
টিপছে নাড়ি বদ্যি খুড়ো,

দিচ্ছে ওষুধ কমসমে,
হয়তো এখন দম দমে।


হয়তো এখন দম দমে,

ছোকরা বুড়ো জুটছে এসে,
রকের উপর বসছে ঠেসে,
কেউ বা শুধুই পাচ্ছে সিঁড়ি,
কেউ বা সুখে ফুঁকছে বিড়ি,
কেউ বা আবার খিদের টানে
যাচ্ছে সিধে ওই দোকানে,

বসাচ্ছে দাঁত চমচমে,
হয়তো এখন দম দমে।


হয়তো এখন দম দমে,

চলছে সভা পাড়ার মোড়ে,
নড়বড়ে এক মঞ্চে চড়ে,
মস্ত দাদা, শামলা গায়ে
চুমুক মেরে উষ্ণ চায়ে
আকাশ পানে নাক উঁচিয়ে
দলবাজী আর বাস্তু নিয়ে

দিচ্ছে ভাষণ গমগমে,
হয়তো এখন দম দমে।